এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে স্পষ্ট দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় একদিকে জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশগুলো বিপুল মুনাফা করছে, অন্যদিকে আমদানিনির্ভর দেশগুলো পড়ছে চরম অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে। বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপের আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি ও শেয়ারবাজারে ধস নামার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খবর ইউরো নিউজ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেলের সরবরাহও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও সব দেশের জন্য পরিস্থিতি এক নয়। কান্ট্রি ইটিএফ ট্র্যাকারের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, একটি দেশ জ্বালানি রফতানি করছে নাকি আমদানি করছে—তার ওপরই এখন সেই দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশগুলোর জন্য এ সংকট এক আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো উচ্চমূল্যের জ্বালানি তেলের কারণে বড় অংকের বাড়তি রাজস্ব পাচ্ছে। ইরাক এ তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে। দেশটির মোট জিডিপির প্রায় অর্ধেক বা ৪০ দশমিক ৮ শতাংশই আসে জ্বালানি উদ্বৃত্ত থেকে। কাতার ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ উদ্বৃত্ত নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের অবস্থানও বেশ মজবুত। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব দেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও সার্বভৌম সম্পদ তহবিলে ডলারের জোয়ার বইছে। ইউরোপের একমাত্র দেশ হিসেবে নরওয়ে এ তালিকায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, যাদের জ্বালানি উদ্বৃত্ত জিডিপির ১৯ দশমিক ১ শতাংশ।
এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে এশিয়া ও ইউরোপের আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে। এশিয়ার দেশগুলো এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানি তেলের বড় আমদানিকারক থাইল্যান্ডের জ্বালানি ঘাটতি তাদের মোট জিডিপির ৭ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুরের অবস্থাও শোচনীয়। জাপানের অর্থনীতিও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া নিজেদের প্রয়োজনের প্রায় ৭৩ শতাংশ জ্বালানি তেল উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে। যুদ্ধের প্রভাবে দেশটির শেয়ারবাজারে ১২ দশমিক ২ শতাংশ ধস নেমেছে। ভারত ও তুরস্কের মতো দেশগুলোও ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
ইউরোপের অবস্থাও খুব একটা সুবিধাজনক নয়। মহাদেশটির প্রায় প্রতিটি দেশই নিট জ্বালানি আমদানিকারক। গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলোতে জ্বালানি ঘাটতি জিডিপির ১ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় শিল্পোন্নত দেশ জার্মানিও ১ দশমিক ৫ শতাংশ ঘাটতির মুখে পড়েছে। এর ফলে জার্মানি ও ফ্রান্সের শেয়ারবাজারে প্রায় ৮ শতাংশ পতন লক্ষ করা গেছে। শিল্প খাতে জ্বালানির উচ্চমূল্য উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারের চিত্র বিশ্লেষণ করলে এ বিভাজন আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরবের শেয়ারবাজার ২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়লেও আমদানিনির্ভর থাইল্যান্ডের বাজারে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ পতন হয়েছে। একইভাবে ভিয়েতনাম ও জাপানের বাজারেও বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তিগুলোও এ সংকটের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্র নিট রফতানিকারক হলেও তাদের উদ্বৃত্ত খুব সামান্য হওয়ায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মিশ্র প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যতদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হবে, ততদিন এ বৈষম্য বাড়তেই থাকবে। একদিকে রফতানিকারক দেশগুলোর সম্পদ বাড়বে, অন্যদিকে আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতিতে মন্দার ছায়া দীর্ঘ হবে। জ্বালানি সংকটের কারণে সৃষ্ট এ মেরুকরণ আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণকেও বদলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।